শিরোনাম

» চন্দ্রনাথে একদিন

চন্দ্রনাথে একদিন

চট্টগ্রাম: একেবারে বাড়ির কাছেই সিতাকুন্ড চন্ত্রনাথ পাহাড়। চট্টগ্রাম জেলার প্রবেশদ্বার মিরসরাই। পরেরটা সিতাকুন্ড উপজেলা। এতো কাছে , অথচ কখনো যা্ওয়া হয়নি চন্ত্রনাথ মন্দির। যেটা শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেও একটি পবিত্র তীর্থস্থান। চন্ত্রনাথ নিয়ে বরাবরই আগ্রহ ছিল আমার। এবার সত্যি সত্যি ঠিক করলাম জয় করবো চন্ত্রনাথ পাহাড়। বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা করে দিনক্ষণ ঠিক করলাম। সিদ্ধান্ত একেবারে পাকাপোক্ত । অবশ্য আমাদের মধ্যে একজন কুমিল্লা থেকে আসবেন অন্যজন রাউজান থেকে।

গেল মাসের ৩১ তারিখ শুক্রবার সকাল ৯টার মধ্যে সিতাকুন্ড বাজারে সমবেত হলাম সবাই। আর আমরা বাকিরা মিরসরাই থেকে গেলাম। আমরা দশটার ভেতর সিতাকুন্ড বাজারে পৌছালাম। বাকি দুই বন্ধুর বিলম্বে সবাই কিঞ্চিত বিরক্ত । যাক আমরা ৮ জনের টিম। ঢাকা -চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিতাকুন্ড বাজার থেকে পূর্বদিক ধরে ভেতরে গেলেই চন্ত্রনাথ পাহাড়। রেল স্টেশন থেকে ৪কি.মি.পূর্বে।

অভিজ্ঞতা থাকায় আগেভাগেই পানি, স্যালাইন নিলাম। স্ন্যাকস হিসেবে সমুচা, সিঙ্গারা, জিলেপি সঙ্গে নিলাম। সিতাকুন্ড কলেজ গেট থেকে সিএনজিতে গাদাগাদি করে মূল গেটে গেলাম , জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া। মূল গেটে পোছাতে ১০ মিনিট সময় লাগলো। সিএনজি থেকে নেমে দেখি আমাদের মত অনেক পর্যটকের আনাগোনা সেখানে। তাদের কেউ নিচে নামছেন কেউ উপরে উঠছেন। যারা নামছেন তাদের ভালোই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আর আমাদের মত যারা পাহাড়ে ছড়ার জন্য প্রস্তুত সবার চোখে মুখে তখন আনন্দ আর কিছুটা উচ্চতা ভিতি কাজ করছে।

বাড়তি সাপোর্টের জন্য ১০ টাকা দিয়ে ছোট বাঁশ কিনে নিলাম। আমাদের দুই একজনের কাঁধে ভারি ব্যাকপ্যাক থাকায় তা রাখার ব্যবস্থা করলাম প্রতি ব্যাগ ২০ টাকার বিনিময়ে। ১ হাজার ২০ ফিট উচ্চতার পাহাড়। উচু-নিছু খাড়া ঢাল বেয়ে শুরু করলাম যাত্রা। কিছু দূর উপরে উঠতে একটা মন্দির দেখলাম, হিন্দু তীর্থযাত্রীরা কেউ কেউ পূজা সেরে নিচ্ছেন। কিছু দূর পর দেখা মিলল শিবের বিশাল মূর্তি।

দুপুর ১২টা তখন । তার উপর ভালোই রোদের তাপ। তবে আমরা থামছি না। টানা হাঁটতে থাকলাম উপরের দিকে। কিছু দূর হাঁটার পর কুমিল্লার বন্ধুটি হাপিয়ে গেছেন। ডাক্তার মানুষতো আগের রাতে হাসপাতালে নির্ঘুম ডিউটি করে ভালোই ক্লান্ত সে। অবশেষে হাল ছেড়ে দিল সে। স্যালাইনের ঠান্ডা পানি খা্ওয়ালম। ১০ মিনিট গাছের নিছে জিরিয়ে নিলাম।ব্যাস আবার চাঙ্গা।

মাঝ পথে ছোট একটা ঝর্ণার দেখা পেলাম। সবাই ঝর্ণার পানিতে নিজেদের একটু রিফ্রেশ করলাম। ঐ পানি চাইলে খাওয়া যায়। বোতলে ভরে নিলাম।সেখানে ছোটখাটো দুটো দোকান আছে যেখানে বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যালাইন, পেয়ারা, লেবু, কলা, আরো কিছু ভাঝাপোড়া। ঝর্ণা থেকে পাহাড়ে উঠার পথ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। ডানদিকের রাস্তা প্রায় পুরোটাই সিঁ‌ড়ি আর বামদিকের রাস্তাটি পুরোটাই পাহাড়ী পথ কিছু ভাঙ্গা সিঁ‌ড়ি আছে।

বাম দিকের পথ দিয়ে উঠা সহজ আর ডানদিকের সিঁ‌ড়ির পথদিয়ে নামা সহজ এমনটাই স্থানীয়রা জানালো। বামপাশ দিয়ে উঠা শুরু করলাম। আমরা একটানা উপরে উঠতে শুরু করলাম। তবে উঠতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছিলো প্রচুর, একেতো খাড়া পাহাড় তার উপর রোদের তাপ। টানা ৩০ মিনিট উঠার পর একটু রেষ্ট নিলাম।

বাকি ২০ মিনিট উপরে উঠার পর প্রথম মন্দিরে পৌছলাম, “ভগবান শ্রী শ্রী স্বয়স্তুনাথ মন্দির”। ওখানে উঠার পর এতো বেশি কষ্ট লাগছিল যেন সবার প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। ১৫ মিনিটের রেষ্ট নিয়ে আবার সোজা হাঁটা দিলাম। চন্দ্রনাথে উঠতে উঠতে আমাদের দুপাশে চোখে পড়লো বিভিন্ন ধরনের গাছ, বুনোফুল এবং গুল্মলতা। দেখা মিললো  পেয়ারা, আম সহ বিভিন্ন ফলের বাগান ।

এরপর আবার টানা ২৫ মিনিট হাঁটলাম। সবাই তখন ক্লান্ত। উচ্চতা ভিতি, রোদের তাপ, ক্লান্ত দেহ।পানি প্রায় শেষ। প্রাণ একেবারে ওষ্ঠাগত। অনেকের অবস্থা যায় যায়। তখন প্রায় দুপুর দেড়টা। বুকটা দরপর করছে।পরবো কি পারবো না। এতো উপরে যে ফিরে যা্ওয়া সম্ভব নয়।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ । চন্দ্রনাথ মন্দিরে এসে পৌছলাম। উপরে , একেবারে উপরে। মনে হচ্ছিলো এভারেষ্ট জয় করেছি, সবাই আনন্দে আত্নহারা। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। উপর থেকে বড় বড় পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে অনেক ছোট ছোট মাটির স্তুপ। যেন সবকিছু আমাদের পায়ের তলায়।

মন্দিরে পুরোহিত পূজাআর্চনা করছেন। এক সাধুবাবা একতারা বাজাচ্ছেন । বেশ আগ্রহ জাগলো আমাদের । বললাম,” বাবা একটা গান শুনান “। উনি বললেন, ” বাবারে গানের কোন মান নাই, কেউ পয়সা পাতি দেয়না ’। আমরা বললাম,  আপনি গান শুনান আমরা টাকা দেবো। উনি একতারা নিয়ে গান ধরলেন, মিলন হবে কতো দিনে, আমার মনের মানুষেরো সনে “। আমরা সবাই সাথে ধরলাম সবাই আস্তে আস্তে আমাদের পাশে ভিড়ছে গান শুনার জন্য অনেকে। আমাদের কেউ এসে বসলো, বাকিরা ফটো তুলতে ব্যস্ত। ৩০ মিনিট থাকার পর গান বাজনা শুনে আমরা উনাকে ৫০ টাকা দিলাম আরো কয়েকজন দিলো টাকা। সাধুর সাথে ছবি তুলে আমরা নিচে নামার প্রস্তুতি নিলাম। নামার আগে কিছু গ্রুপ ছবি নিলাম। নিচে নামার সিঁড়ি মন্দির বরাবর পশ্চিমে।

অল্প কয়েক সিঁড়ি নেমে সবাই নাস্তা করে নিলাম। নাস্তা সেরে আবার নামা শুরু করলাম, একটু নামার পর খেয়াল করলাম এতো বেশি খাড়া সিঁড়ি যে পা একটু একটু কাঁপছে। নামতে  প্রায় ১ ঘন্টা লেগে গেলো। সিতাকুন্ডের মত এতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার চোখে আর পড়েনি, সেখানে যতক্ষন ছিলাম ততক্ষন মনে হচ্ছিলো এক অনাবিল আনন্দ আর আনন্দ। চাইলে আপনি্ও ঘুরে আসতে পারেন । যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ শুধুই এডভেঞ্চার।