শিরোনাম

» দেশের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানে পর্যটন সম্ভাবনা

দেশের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানে পর্যটন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রচুর ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। প্রায় দেড় হাজার ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ দর্শনীয় স্থান থাকলেও তার অনেকই এখনো বিশ্ববাসীর অজানা। যেগুলোর আকর্ষণ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক ওইসব স্থাপনা দেখতে প্রচুর সংখ্যায় বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে ভ্রমণ করেন।

গত বছর দশম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টার্সের সভায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গত ১১-১২ জুলাই এ অর্জনকে উদযাপনও করা হয়। ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ওআইসি এ জন্য ১৩০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে পর্যটক আকর্ষণে ব্যর্থ হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, ভুটান ও নেপাল অনেকটা এগিয়ে। তাই ওআইসি’র সহযোগিতা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যতে পারলে বাংলাদেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোও বিশ্বের অন্যতম পর্যটন গন্তব্য হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। হালনাগাদ সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এটা অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্থানে ভ্রমণে আগ্রহী পর্যটকের সংখ্যা কম নয়। তবে পর্যটক আকর্ষণে আরও প্রচারণা ও পরিকল্পনামাফিক আগানোর কথা বললেন তারা।

সূত্র মতে, ভবিষ্যতে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। ঢাকাকে ওআইসি’র পর্যটন নগরী ঘোষণা করা এবং ১৩০ কোটি টাকার সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর সংস্কার ও সজ্জিতকরণ সম্ভব হবে। এতে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। ঢাকার পর্যটনগত ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে, বাড়বে ঢাকা ভ্রমণের আগ্রহ। এর আগে ওআইসি’র অঙ্গসংগঠন ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০১২ সালের জন্য ঢাকাকে ইসলামী সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও ঢাকার মর্যাদা তৈরি করেছে। এরই অংশ হিসেবে ধর্মীয় স্থানকেন্দ্রিক ‘হালাল’ পর্যটন জোরদারে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক ও ইরান। সউদী আরবও ধর্মীয় পর্যটন বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
আগামী ৭ থেকে ৯ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী ওআইসি’র অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইসলামিক সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব ট্রেড (আইসিডিটি) অনলাইন ইকো ট্যুরিজম ওয়ার্কশপের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভ্রমণপিপাসু অধিকাংশ বাংলাদেশীদের মতে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানগুলোকে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। শুধু ঢাকাতেই এমন প্রচুর ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমজিদ বায়তুল মোকাররমের অবস্থান। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ঐতিহ্যে এ মসজিদের অবস্থান শীর্ষে। এ ছাড়াও ঢাকার নামকরা আরও বেশ কিছু মসজিদ রয়েছে। সেগুলো হলো- লালবাগ শাহী মসজিদ, বেগম বাজার শাহী মসজিদ, গুলশান আজাদ মসজিদ, কসাইটুলি মসজিদ, খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ, হাইকোর্ট মাজার মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, মোহাম্মদপুর সাতমসজিদ, তারা মসজিদ, মুসা খাঁ মসজিদ, লালবাগ দুর্গ মসজিদ, বিনত বিবির মসজিদ, কাওরান বাজারের আম্বরশাহ মসজিদ ও গোলাপ শাহ মসজিদসহ অসংখ্য মসজিদ।

ঢাকার বাইরে অনুপম ও আকর্ষণীয় স্থাপত্যরীতির মসজিদগুলোর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ, বরিশালের বায়তুল আমান মসজিদ, চট্টগ্রামের চন্দনপুরা মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সোনা মসজিদ, নোয়াখালীর বজরা শাহী মসজিদসহ অসংখ্য মসজিদ।


মসজিদ ছাড়া বিখ্যাত মাজার ও দরগার মাঝে রয়েছে সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজার ও হজরত শাহ পরানের মাজার। চট্টগ্রামে হজরত বায়েজিদ বোস্তামির মাজার ও হজরত শাহ আমানতের দরগা শরিফ। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর সুফি-দরবেশদের মাজার ছড়িয়ে আছে। এসব দরবারে সারা বছর বিভিন্ন ধর্মীয় মাহফিল হয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ একত্রিত হয়। সেখানেও প্রচুর সংখ্যায় বিদেশি আগমন করে থাকেন।
বাংলাদেশের অপূর্ব সুন্দর শিল্প অনুপম স্থাপত্যের নিদর্শন, যা দেশ-বিদেশের বহু পর্যটককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। ধর্মীয় উৎসব এ দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে, যা বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করে অধিক পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) পরিচালক তৌফিক রহমান বলেন, ধর্মীয় কারণ ছাড়াও উৎসবকে কেন্দ্র করে পর্যটকরা আসছেন। তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি বছর ইংল্যান্ড, চীন, থাইল্যান্ড থেকে খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের বহু পর্যটক বাংলাদেশে আসেন ঈদ, ইজতেমা ও রাসমেলা দেখতে। তারা এখানে ধর্মীয় কারণে নয়, বরং এসব উৎসব দেখতে আসেন।

বাংলাদেশে ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ প্রায় দেড় হাজার স্থান থাকলেও তার অনেকই এখনো বিশ্ববাসীর অজানা। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) ফাউজুল কবীর মঈন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানে পর্যটনের প্রসার ঘটাতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে মহাপরিকল্পনাও করছে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড।

বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশ্বজুড়ে মুসলিম পর্যটকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাই ধর্মীয় স্থানগুলোতে পর্যটন শুরু হলে আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মীয় ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানের পর্যটন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়ে উঠতে পারে দেশের আয়ের অন্যতম খাত।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ড. ভুবন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ধর্মীয় ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্মতাত্তি¡ক নিদর্শনগুলো পর্যটন উপযোগী করতে ধর্ম ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করছে। ধর্মীয় ও হালাল পর্যটন বাড়াতে আমরা ইতোমধ্যে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছি