শিরোনাম

» পর্যটন শিল্পে প্রযুক্তির রূপান্তরঃ আমরা কি প্রস্তুত?

পর্যটন শিল্পে প্রযুক্তির রূপান্তরঃ আমরা কি প্রস্তুত?

বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ এবং অর্থ আদান-প্রদান হচ্ছে প্রযুক্তিগত ভাবে। এক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড, ইব্যংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে প্রযুক্তিগত মঞ্চসমুহ, ব্যবহারকারীর তৈরীকৃত বিষয়বস্তু এবং ফিডব্যাক, সামাজিক মাধ্যম, বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণায়ক সেবাসমূহ এবং বৃহৎ উপাত্ত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তা, ভোগ এবং ভাগ করার পদ্ধতিতে রূপান্তর ঘটিয়েছে”।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তে বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপিত হতে যাচ্ছে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এবারের পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে- “পর্যটন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর”। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার ১৫৮ টি দেশে একযোগে এই দিনটি সাড়ম্বরে পালন করা হবে। এ বছর দিবসটি উদযাপনে হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে হাঙ্গেরীকে নির্বাচিত করা হয়েছে।

যাই হোক, প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভ্রমণ ব্যবসা আকাশচুম্বি হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রতারকদের করা ক্ষতিটাও ব্যাপক। এরকম কতিপয় প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতারণার বিবরণ দেয়া হলোঃ

ডোমেইন স্কোয়াটিংঃ এতে প্রতারকরা একটি নির্দিষ্ট ডোমেইনের ভ্রমণ বিষয়ক পোর্টালগুলোতে আগত গ্রাহকদের নিজেদের দিকে নিয়ে আসে এবং এসকল গ্রাহকদের প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।

ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিঃ পর্যটন শিল্প ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতরা তাদের ভাড়া করা ওয়েটারদের বিশেষ ধরনের পকেট সাইজের ‘স্কিমার’ সরবরাহ করে। গ্রাহক যখন ওয়েটারকে ক্রেডিট কার্ডটি দেয় তখন ঐসব অসৎ ওয়েটাররা সেই ‘স্কিমার’ এ গোপনে সোয়াইপ করে। এতে ক্রেডিট কার্ডের চিপে থাকা সকল গোপন তথ্য জালিয়াতদের কাছে পাচার হয়ে যায়। জালিয়াতরা ঐ কার্ডের ক্লোন করে এবং অর্থ আত্মসাৎ করে।

কার্ড মিলঃ প্রতারকরা পর্যটকের নিকট বিমানের টিকেট বা হোটেলের ওপর ৫০% বা তারো বেশী সুবিশাল মূল্যহ্রাসের প্রস্তাব পাঠায়। এরপর পর্যটকদের একটি নির্দিষ্ট অংকের ফি পাঠাতে বলা হয়, যাতে করে তারা ঐ সকল সেবাগুলোতে প্রস্তাবিত মূলহ্রাস পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে। লোভী পর্যটকেরা পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে।

ভূয়া ওয়েবসাইটঃ এতে প্রতারকরা কোন নামি হোটেল, ট্রাভেল এজেন্ট ইত্যাদির ওয়েবসাইটের মতো দেখতে অবিকল একই রকম ওয়েবসাইট তৈরী করে। প্রতারকরা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে এসকল ওয়েসাইটের মাধ্যমে ফাঁদে পড়া পর্যটকদের ক্রেডিট কার্ড এবং এর মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

অনলাইন বিমান টিকেট জালিয়াতিঃ ভূয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মূল্যহ্রসকৃত বিমান টিকেটের তথ্য দিয়ে গ্রাহকদের আকর্ষণ করা হয়। ক্রেডিট কার্ড প্রবেশ করানোর পর গ্রাহককে জানানো হয় যে কারিগরি গোলযোগের কারণে ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট নেয়া যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে গ্রাহককে অন্য উপায়ে সরাসরি টাকা পাঠাতে বলা হয়।

ইমেইল ফিসিং: কোন অনামা প্রতিষ্ঠান হতে ইমেইলের মাধ্যমে একটি বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী অবকাশযাপন অথবা কোন সমুদ্র বিহার জয় করার জন্য অভিনন্দন বার্তা প্রেরণ করা হয়। এসকল লোভনীয় প্রস্তাবের মাধ্যমে পর্যটকের ব্যক্তিগত তথ্য, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নেয়।

ভূয়া অনুমোদনঃ এ পদ্ধতিতে প্রতারকেরা নিজেদের সরকার বা কোন নামী হোটেল, ট্রাভেল এজেন্ট ইত্যাদির অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান দাবী করে। গ্রাহক সরল বিশ্বাসে নিজের গোপনীয় আর্থিক তথ্য দিয়ে দেয় এবং প্রতারকের শিকারে পরিণত হয়।

প্রচারণা ও বিপণনঃ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আয়োজিত বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং সংক্রান্ত একটি সেমিনারে পর্যটন শিল্পের স্টেকহোল্ডারগণ বাংলাদেশের প্রচারণা বার্তা হিসেবে “রূপময় বাংলাদেশ” শব্দদ্বয়ের ব্যবহারের সাথে দ্বিমত পোষন করেন। তাঁরা বলেন প্রচারণায় ৩টি বিষয় লক্ষ রাখতে হবেঃ পর্যটন, বিদেশী বিনিয়োগ এবং দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রচার করা। জন্ম থেকেই পর্যটন করপোরেশন একটি স্বায়ত্বশাসিত ও বাণিজ্যিক সংস্থা হওয়ায় এটি কখনোই প্রচারণার জন্য সরাসরি রাজস্ব সহযোগিতা পায়নি। বর্তমান সরকারের পূর্বে পর্যটন খাতে বাজেট বরাদ্দ বলতে গেলে ছিলোইনা। তা সত্ত্বেও পর্যটন করপোরেশন নিজস্ব সীমিত সক্ষমতায় ছাপানো এবং ভিডিও প্রচারসামগ্রী তৈরী করেছে। এসব সামগ্রী গত ৪৭ বছর ধরে সামরিক ও বেসামরিক সংস্থাগুলো বিদেশে দেশের প্রচারণা কাজে ব্যবহার করে আসছে। মূলত কতিপয় উচ্চাভিলাষি ট্যুর অপারেটরদের ক্রমাগত প্ররোচনা ও চাপে একজন আমলার পরিকল্পনায় পর্যটনের প্রচারের জন্য আরেকটি সংস্থা তৈরী হলেও তারা আজ অব্দি পর্যটন শিল্পের জন্য প্রচারণা ও বিপণনের জন্য টেকসই নীতিমালা তৈরী ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি। বিপণন সংক্রান্ত পাতাটিতেও কিছু পাওয়া যায় না।

প্রণোদনা নীতিমালাঃ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ট্যাক্স হালিডে, ভ্যাট মওকুফের মতো বিষয় উল্লেখ থাকলেও পর্যটন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে ১৯৯২ সালের পর্যটন নীতিমালা অনুযায়ী নৌপর্যটন প্রসারে জাহাজ ক্রয় এবং পর্যটনের অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এক সভায় সরকারি কর্মকর্তা ও পর্যটন ব্যবসায়ীগণ ঐক্যমত পোষন করেন। এবিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সুপারিশ জানানো হবে বলে সভায় জানানো হয়।

অভ্যন্তরীণ পর্যটনঃ অভ্যন্তরীন পর্যটন বৃদ্ধি এই শিল্পের কলেবর বৃদ্ধি, কাঠামো উন্নয়ন, পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি, যোগাযোগ, খাবার ও আবাসন সহ পর্যটন শিল্পের সকল পণ্য ও সেবা উন্নয়নের চাবিকাঠি বলে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীন পর্যটন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।  পার্বত্য এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। বিশেষত সাজেকে হাজার হাজার পর্যটন ভীড় করছে। এসব পর্যটকের নিরাপত্তা দিচ্ছে সেনাবাহিনীর সদস্যগণ। ট্যুরিস্ট পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী হলি আর্টিজান বেকারীতে সন্ত্রাসী হামলার পর ৬ মাস পর, ১ জুলাই ২০১৬ তে অভ্যন্তরীন পর্যটকের সংখ্যা ছিলো ৯০,০০০ জন, যা ২০১৭ সালে এক লাফে ৩৫০ মিলিয়নে উন্নীত হয়!

ভাবমূর্তি সমস্যাঃ ট্যুর অপারেটর ও অন্যান্য সংস্থার প্রচারণার ভুলে দেশ সম্পর্কে প্রায়শই ভুল বার্তা বিদেশীদের কাছে পৌঁছায়। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব ব্রোশিওর বিদেশে পাঠায় সেখানে দেখা যায় বাংলাদশের মানুষ বাস, ট্রেন অথবা জাহাজের ছাদে চড়ছে। এসব ছবি সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে ভুল বার্তা দেয়। রিকশা বাংলাদেশের প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যে বাহনটি একটি দেশের পশ্চাতপদতাকেই নির্দেশ করে।

কাঠামোগত উন্নয়নঃ কতিপয় বিশেষায়িত পর্যটন অঞ্চল সহ প্রায় ৩০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। টেকনাফে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রায় ১২০০ একর জায়গা বেজা র নিকট হস্তান্তর করেছে। সেখানে বিশ্বমানের পর্যটন অঞ্চল তৈরীর কাজ এগিয়ে চলছে। নাফ নদীর ছোট দ্বীপের ২৫০০ একর জমিতে থাইল্যান্ড ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র তৈরী করবে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে উন্নীত করার কাজ ও এগিয়ে চলছে। যদিও দেশের রেল সংযোগ এখনো আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। তবে সরকার রেল যোগাযোগ উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

পর্যটন মানবসম্পদঃ ১৯৭৪ সাল হতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এর অধীনস্থ এবং একমাত্র জাতীয় ও সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান “ন্যাশনাল হোটেল এন্ড টুরিজম ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট”  টুরিজম খাতে মানব সম্পদ তৈরী করার কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানটি এযাবৎ প্রায় ৪৭ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে হোটেল ও পর্যটন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। যারা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন তারকা হোটেলে কাজ করছে। সম্প্রতি এ খাতে আরো বেশ কটি বেসরকারী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে মানসম্মত প্রতিষ্ঠান খুবই কম। এখাতে উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও  দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরো কয়েকটি হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

পর্যটন কর্তৃপক্ষঃ পর্যটন পণ্য ও সেবাসমূহের মান নিয়ন্ত্রন, লাইসেন্স প্রদান, খাবারের হাইজিন নিশ্চিত করণ, ট্যুর অপারেটরদের সেবা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন সরকারী প্রতিষ্ঠান নেই। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এর সারাদেশব্যাপী স্থাপনা ও কাঠামো রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে পর্যটন কর্তৃপক্ষ হিসেবে রূপান্তর করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্প্রতি পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।

একক ও স্বতন্ত্র পর্যটন মন্ত্রণালয়ঃ পর্যটন শিল্পের ধীরযাত্রার জন্য একটি অন্যতম বাধা হচ্ছে এর নিয়ন্ত্রক একক মন্ত্রণালয় না থাকা। কেবল মাত্র পর্যটন শিল্পের জন্য স্বতন্ত্র ও একক মন্ত্রণালয় জরুরী হয়ে পড়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তা করবেন।

শেখ মেহদি হাসান

উপব্যবস্থাপক (বিপণন)

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন